কোনো দুর্বৃত্ত এখন আর কারো ভোটে হাত দিতে পারবে না ইনশাআল্লাহ: ডা. শফিকুর রহমান

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি)  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার আমির অধ্যাপক রমজান আলীর সভাপতিত্ব  কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্য বলেছেন, “আমার এক্স আইডি হ্যাক করে সেখান থেকে অত্যন্ত নোংরা ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে। আমাদের সাইবার টিম সেটা দ্রুত রিকভারি করে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং পেয়েও গেছে, কোন জায়গা থেকে কারা এটি করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, সবকিছু স্পষ্ট হওয়ার পরেও একটি রাজনৈতিক সংগঠন এটা নিয়ে এখন ব্যবসা করছে।”

তিনি বলেন, ‘এই দিন আর ফিরে আসবে না। চব্বিশের যুবকেরা ঘুমিয়ে পড়েনি। জেগে আছে। তার ভোটের পাহারাদারি সে করবে, সাথে সাথে সকলের ভোটের পাহারাদারি করবে। কোনো দুর্বৃত্ত এখন আর কারো ভোটে হাত দিতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। আমরা প্রশাসনকে বলব, আপনারা স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার সাথে, সততা এবং সাহসিকতার সাথে আপনার দায়িত্ব পালন করবেন। জাতি আপনাদের জন্য দোয়া করবে। ১৮ কোটি মানুষ আপনাদের পাশে থাকবে। আপনারা মেহেরবানি করে কারো কোনো ডান-বাম কথা শুনবেন না। আমরা কারও কাছে কোনো আনুকূল্য চাই না। কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করতে আসলে আমরা কিন্তু ছেড়ে দেব না। উনি যেই হউক। আমার অধিকার আমার রক্ষা করতে হবে। এ লড়াই চলবে ইনশাআল্লাহ।’

জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘আমার অধিকার মানে কী? আমি আপনাদেরকে স্বাক্ষী রেখে পরিষ্কার বলছি, আমার অধিকার মানে এই দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ১৮ কোটি মানুষের অধিকার। আমরা জামায়াতে ইসলামী দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও আমি চাই না। আমি ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে সে বিজয় আমাদের সবার। দল, গোষ্ঠী, পরিবারতন্ত্রের রাজনীতির কোনো বিজয় আমাদের কাছে নেই। কন্ঠ আমাদের অত্যন্ত পরিস্কার। এই পথে পুরনো রাস্তায় যারা হাঁটতে চাইবে অন্ধকারের গলিতে তাদের রাস্তায় তারা হাঁটুক আমরা আলোকিত রাস্তায় হাটব ইনশাআল্লাহ। আর জাতি আলোকিত রাস্তায় হাটবে। জাতি কোন দিকে ইতোমধ্যেই আলামত স্পষ্ট। যুব সমাজ সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেছে। ৫টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে বলে দিয়েছে তারা ন্যায় ইনসাফের পক্ষে। আমরা আগামীর বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা যুবকদের চব্বিশের আকাঙ্খার পক্ষে। এ রায় তারা দিয়ে দিয়েছে।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ জেলার মানুষ স্বভাবগতভাবেই ধর্মপ্রাণ। কিন্তু তারা অন্যান্য ধর্মের সাথেও চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এটিই ধর্মের সৌন্দর্য। আমরা দেশটাকে সব ধর্ম দিয়ে ফুলের বাগানের মতো সাজাবো। আমরা আমাদের প্রিয় জাতিকে টুকরাে টুকরাে করতে আর কাউকে সুযোগ দেব না। অতীতের কাসুন্দি শেষ। ওইগুলো শুনিয়ে শুনিয়ে জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে জনগণের কপাল কিসমত যারা হাইজ্যাক লুটপাট করেছে তাদের জায়গা বাংলাদেশে আর হবে না। চব্বিশের যুব সমাজ অতীতের পচা রাজনীতির জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করে নাই। তারা পরিবর্তন চেয়েছে। ১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশে সে পরিবর্তনের সূচনা হবে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘জুলাইযোদ্ধারা যখন রাস্তায় নেমেছিল, তখন যেমন আমাদের ছেলেরা যুদ্ধ করেছে, লড়াই করেছে, মেয়েরাও লড়াই করেছে। এদেশে আমাদের জন্য ছেলে-মেয়েদের, মা-বোনদের, আবাল, বৃদ্ধা, বনিতা, সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। আগে তো আমার নিরাপত্তা তার পরে উন্নয়ন। দুইটাই আমাদের দরকার, কোনোটাই আমাদের নাই। বিপুল সংখ্যক যুবক চাকরিবিহীন। তারা সেদিন রাস্তায় নেমে বলে নাই আমাদেরকে বেকার ভাতা দেন। তারা সেদিন বলেছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরা চাই আমাদের মেধার সুবিচার করা হোক। কোনো মামু-খালুর টেলিফোনে অথবা কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে আমার কপাল যেনো চোরাবালিতে হারিয়ে না যায়, আমার কপাল আমাকে দিতে হবে। আমার যোগ্যতা মেধা অনুযায়ী আমার কাজ আমার হাতে তুলে দিতে হবে। এই দাবি নিয়ে তারা রাস্তায় নেমেছিল।’’

তিনি বলেন, ‘আমরা তোমাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তোমাদের হাতকে বাংলা গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করব ইনশাআল্লাহ। তোমাদের হাতে বেকার ভাতা নয় তোমাদের দাবি অনুযায়ী তোমাদের মর্যাদার সাথে সেই কাজগুলো তোমাদের হাতে তুলে দেব ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ তোমরাই গড়বা তোমরাই চালাবা। সেদিন তোমারা গর্ব করে বলবা আমিই বাংলাদেশ। আমরাই বাংলাদেশ। এটি আমার প্রিয় বাংলাদেশ। সেদিনের অপেক্ষায় যুবকেরা আছে। এই দেশটাকে তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই, তোমরা কি প্রস্তুত? সুসংবাদ গ্রহণ কর। বাংলাদেশ নামের উড়োজাহাজ, ওই উড়োজাহাজের ড্রাইভিং সিটে আমরা তোমাদের বসিয়ে দিব। এই দেশটাকে নিয়ে তোমরা সামনের দিকে আগাবা। পেছনে তাকানোর সময় আমাদের শেষ এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পিছন দিয়ে যারা কামড়াকামড়ি করে তাদের কামড়াকামড়ি করতে দেব আমরা। ওরা করুক আমরা এগিয়ে যাবো জাতিকে নিয়ে সামনে, ইনশাআল্লাহ। তখন তোমরা থাকবে ককপিটে আমরা থাকব পেসেঞ্জার সিটে।’

হাওরাঞ্চল নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তিন ভাগের এক ভাগ হাওর এলাকা। এই হাওর আমাদের পেটের খাদ্যের যোগান দেয়। শুধু ভাত না, এই হাওর আমাদের প্রোটিনও সরবরাহ করে। কিন্তু আজকে নদীগুলোকে খুন করা হয়েছে। হাওরগুলো বিলগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা এগুলোতে হাত দেব। নদীর জীবন ফিরে আসলে বাংলাদেশের জীবন ফিরে আসবে। কাজেই নদী দিয়েই আমাদের উন্নয়নের সংস্কার শুরু হবে।’

নারীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মায়েদের ঋণ পরিশোধ করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? কিন্তু আমাদের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে হবে। ১৫ জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলিজার টুকরা মেয়েদের গায়ে উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীরা হাত দিয়েছিল সেদিনই বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠেছিল। মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু তার মায়ের অপমান সহ্য করতে পারে না। সমানভাবে তরুণদের সাথে তরুণীরা, যুবকের সাথে যুবতীরা, ভাইয়ের সাথে বোনেরা, বাবার সাথে মায়েরা চব্বিশে যুদ্ধ করেছে। আমরা মায়েদেরকে কথা দিচ্ছি আপনাদের সমাজের সকল দিক থেকে সম্মানিত করব। অংশ হিসেবেই আমরা মাথায় তুলব। এটা আমাদের দায়িত্ব। যে জাতি মাকে সম্মান করে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মান বৃদ্ধি করে দেয়। আর যে জাতি মায়ের সম্মান রাখতে পারে না আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্মান উঠিয়ে নেয়।’

এক্স একাউন্ট হ্যাক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় মায়েদের সাথে অশালীন আচরণ করা হয়। আমি তার প্রতিবাদ করি। কিছু লোক এখন আমার পিছনে লেগে গেছে। আমার এক্স একাউন্ট হ্যাক করে অত্যন্ত নোংরা মেসেজ সেখান থেকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের আইটি টিম সাইবার টিম খুব দ্রুত সেটাকে রিকোভারি করে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং পেয়েও গেছে, কোন জায়গা থেকে কারা এই কাজ করেছে। আশ্চর্যের বিষয় একটি রাজনৈতিক দল এই সবকিছু স্পষ্ট হওয়ার পরেও এইটা নিয়ে তারা এখন ব্যবসা করছেন। বন্ধুরা মানুষ চিনে কে কাকে কিভাবে সম্মান করতে হয়। আমরা অনেক জায়গায় কথা নিয়ে যেতে পারছি না সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আপনারা যেভাবেই হউক আমাদের কথাগুলো পৌঁছে দিচ্ছেন এইজন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ। যদি কারও চরিত্র হননের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু করেন তাহলে রাসুলে করিম (সাঃ) এর হাদিস অনুযায়ী ওই পাওনাটা বুঝে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা সকলের জন্য আল্লাহর দরবারে হেদায়েতের দোয়া করি।’

‘ভাইয়েরা বোনেরাও তারা তাদের মতামত ব্যক্ত করা শুরু করেছেন। এখানে ১১ দলের কেউ মাইন্ড করবেন না। কেউ বলে আমরা ইসলামি দলের কাছে নিরাপদ। কেউ সোজাসাপ্টা বলে আমরা জামায়াতের হাতে নিরাপদ। এই অবস্থা দেখে অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জে তো এখন চৈত্র মাস? না? মাঘ মাস? মাঘ মাসে যদি মাথা এতো গরম হয় চৈত্র মাসে কি হবে? ধৈর্য ধরুন। ১২ তারিখ পর্যন্ত ধৈর্য ধরুন। জনগণের রায়কে সম্মান করুন। সুষ্ঠু ভোটে যেই নির্বাচিত হয়ে আসুক আমরা তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু চোরাই পথে আর কোনো নির্বাচন হবে না। ইনশাআল্লাহ হতে দেওয়া হবে না। সমস্ত চোরাই গলি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই পথেই আমরা এগিয়ে যাব’, যোগ করেন তিনি।

জামায়াতের আমির বলেন, আমরা চাচ্ছি মানুষ শান্তিতে নিরাপদে থাকবে। কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাবে। একজন শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা পাবে শ্রমের। এবং সে মানবিক মর্যাদায় সেখানে কাজ করবে। এই দেশে হাত পাতা মানুষ থাকবে না। হাত মজবুত হয়ে কাজ করার মানুষ থাকবে। এরপরে যাদের হাত কাজ করতে পারবে না তাদের দায়িত্ব সরকার নেবে। একটা সুস্থ সবল জাতি গঠনের জন্য ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত চিকিৎসার দায়িত্ব নিবে সরকার। আমরা বলেছি একটা শিশুও আর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না।

নির্বাচনি জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার আমির অধ্যাপক রমজান আলী।

বক্তব্য শেষে কিশোরগঞ্জের-২, কিশোরগঞ্জ-৩, কিশোরগঞ্জ-৪, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

এ সময় কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীর হাতেও রিকশা প্রতীক তুলে দেন তিনি।